কেন রাজনীতি সেবা নয় পেশা, জানলে আপনিও হতে পারেন ----? Why politics is not a service but a profession?

শুভকল্যাণ বিশ্বাস - আমরা জানি রাজার নীতি রাজনীতি। পুরান, বেদ, সাহিত্য, ধর্মগ্রন্থ ও কাব্যগ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, রাজা প্রজাদের কল্যাণে যে নীতির ব্যবহার করতেন সেটাকেই রাজনীতিক হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। কিন্তু রাজা যদি প্রজাদের কল্যাণ বাদ দিয়ে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নীতি প্রয়োগ করতেন সেটাকে বলা হতো কূটনীতি। সারা বিশ্বের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিচার বিশ্লেষণ করে বোঝা যায়,কোন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান সেই রাষ্ট্রের প্রজা বা জনগণের কল্যাণের জন্য যে বৈদেশিক নীতির ব্যবহার করেন বা প্রয়োগ করেন সেটাকে বর্তমান সময়ে বলা হয়ে থাকে বিদেশনীতি অর্থাৎ পূর্বে বা পুরাণে এটাকে বলা হত  কূটনীতি।
 বেদ পুরাণ ঘাঁটলে দেখা যায়  দেবতাদের মধ্যে মতানৈক্য ছিল। এই মতানৈক্য থেকেই জন্ম হতো কূটনীতির। নিজের ক্ষমতা জাহির বা প্রদর্শন করার জন্য  দেবতাদের মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হত। আর নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দিতা করার কারণেই কোনো কোনো সময় অসুররা দেবতাদের পরাজিত করে দিত যুদ্ধে। এক কথায় বলতে গেলে দেবতাদের মধ্যে ঐক্য ছিলনা। দেবরাজ ইন্দ্র সবসময় নিজেদের মধ্যে লবি বাজি করে নিজেকে জাহির করার চিন্তাভাবনা করতেন। দেবাদিদেব মহাদেবের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তিনি ছিলেন দেবতাদের দেবতা।  মহাদেব বা দেবাদিদেব । তিনি কর্মে বিশ্বাসী ছিলেন । প্রত্যেক দেবতাই দেবাদিদেব মহাদেব কে ভয় পেতেন। অনেক অসুররাজ মহাদেবের বর পেয়ে দেবতাদের উপর আক্রমণ করতেন। আর এই আক্রমণ কে প্রতিহত করার জন্য স্বয়ং মহাদেব কে দায়িত্ব নিতে হতো।
 এখন কথা হলো পুরান এবং বর্তমান সময়ের রাজনীতির মধ্যে মিল কোথায় পাওয়া যায়? আমরা যদি নিজেরাই বিচার বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাব, দেবতাদের মধ্যেই মতানৈক্য ফুটে উঠেছিলো বিভিন্ন ভাবে।
 আর মানুষের মধ্যে মতানৈক্য থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই মতানৈক্য যদি তৈরি হয় ব্যক্তিগত স্বার্থে তাহলে কূটনীতির জন্ম হবে সেখান থেকেই। কিন্তু মতানৈক্য  যদি তৈরি হয় সামগ্রিক স্বার্থে তাহলে সেখান থেকেই তৈরি হয় রাজনীতি।
 চাণক্য তার অস্ত্রশস্ত্র রচনা করে গেছেন  রাজ্য পরিচালনার বিভিন্ন সূত্র  অথবা নিয়ম। সেই নিয়ম গতানুগতিকভাবে প্রজাদের মধ্যে প্রয়োগ করা না গেলেও  বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই নিয়ম লাগু করা গেছে। বর্তমান সময়ে  বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট  এতটাই খারাপ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে মানুষ রাজনৈতিক কোনো কথা শুনতেই চাইছে না।
এই সভ্য সমাজ রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতাদের খুবই খারাপ চোখেই দেখেন। তাঁদের চিন্তা ভাবনা গুলি ঠিক কি রকম দুই একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরা যাক।
দুজন শিক্ষকের স্কুলের লাইব্রেরিতে বসে কোনো রাজনীতির বিষয় নিয়ে মতানৈক্য তৈরি হয়েছে এবং প্রচন্ড কথা কাটা কাটি হয়েছে। তাঁদের মতানৈক্য হলেও  তারা দুজন কিন্তু এক মত  হয়েছে একটি বিষয়ে। সেটি হল রাজনীতি খুব নোংরা জিনিস,যারা রাজনীতি করে তারা কেউ ভদ্রলোক নয়।
অথচ এরা কেউ নিজেরা সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক নন। কিন্তু নিজেরা আবার দোষারোপ করতে ছাড়ছেনা। এরা জানে পাঁকে পদ্ম ফুল ফোটে কিন্তু এই পদ্ম ফুল টাই কিন্তু লক্ষ্মী পুজোতে কাজে লাগে।
 কিন্তু এরা জানেনা সমাজ থেকে নোংরা পরিষ্কার করতে হলে নিজেকেই নোংরার মধ্যে প্রবেশ করতে হবে তবেই সেই নোংরা পরিস্কার হবে।
 আমরা বাড়িতে টিয়া কাকাতুয়া ময়না পাখি পুষলেও কাকের গুরুত্ব কিন্তু কমে যায় না। এই পাখি ছিল বলেই  পরিবেশটা পরিচ্ছন্ন রাখতে সাহায্য করে কাকেরা।
 সুন্দরকে আমরা সকলেই সুন্দর বলতে পারি  কিন্তু অসুন্দর জিনিস কে সুন্দর বলার মানুষ পৃথিবীতে কম পাওয়া যায়। মানুষের জীবন গতানুগতিক ধারায় প্রবাহমান। চলমান সমাজের সঙ্গে তারা  প্রতিনিয়ত নিজেকে আপডেট করে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। প্রবর্তনের সঙ্গে মানুষ নিজেকে মানিয়ে নিলেও তার জিনগত বৈশিষ্ট্যের কোন রকম পরিবর্তন ঘটাতে পারেনি এই সভ্য সমাজের মানুষ। এই শিক্ষিত সমাজের মানুষরা বেশি ঘুমানো ও অমানবিক। তারা রাজনীতিকে নোংরা ভাষায় গালিগালাজ করলেও  রাজনীতিকে নোংরা মুক্ত করতে চায়না কখনও।
 সেই কারণেই অসভ্য ধান্দাবাজ লোক গুলো রাজনীতিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এরা সমাজের কাছে যতটা দায়ী তার থেকে বেশি দায়ী সভ্য সমাজের মানুষেরা। শিক্ষিত ভদ্র সামাজিক সাংস্কৃতিক মনোভাবাপন্ন মানুষ যদি রাজনীতি করতো তাহলে ধান্দাবাজ লোকজন রাজনীতিতে ঠাঁই পেত না। এই ধান্দাবাজ লোকগুলি তাহলে রাজনীতিকে ব্যবসায় পরিণত করতে পারত না। এই সমাজের অধঃপতনের জন্য যতটা দায়ী অশিক্ষিত মানুষ  তার থেকে হাজার গুন বেশি দায়ী শিক্ষিত সমাজের মানুষগুলো।
 শিক্ষিত মানুষগুলোর মুখে একটাই কথা শুনতে পারা যায় ,রাজনীতি এখন একটা বিনা পুঁজির ব্যবসা।
 কেন রাজনীতি ব্যবসায় পরিণত হলো সেটা তারা মূল্যায়ন করেনা। আমাদের মত ভদ্র শিক্ষিত  মানুষ যদি প্রতিবাদ না করে সমাজের অন্যায় দেখে তাহলে সমাজে তো অধঃপতনের মুখে ঢলে পড়বে এই শিক্ষিত মানুষ গুলোর কারণে। যারা রাজনীতির ব্যবসায় পরিণত করেছে তারা যেমন যায় তেমনি সমানভাবে দায়ী থাকবে শিক্ষিত বোবা মানুষগুলো।
 যেদিন এই সমাজের শিক্ষিত ভদ্র মানুষ গুলো অন্যায় দেখে প্রতিবাদ করবে সেদিন থেকে আর রাজনীতি ব্যবসায় পরিণত হবে না।

Comments